ফ্যান জোরে ঘুরলে বিদ্যুৎ খরচ

ফ্যান জোরে ঘুরলে বিদ্যুৎ খরচ কি বেশি হয়? জেনে নিন আসল সত্য

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে আমাদের ঘরে ঘরে সিলিং ফ্যান একটানা চলতে থাকে। অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন বারবার ঘোরে যে ফ্যান জোরে ঘুরলে বিদ্যুৎ খরচ আসলেই বেশি হয় কি না। অনেকে ভাবেন ফ্যানের স্পিড কমিয়ে রাখলে হয়তো মাসের বিদ্যুৎ বিল অনেক কম আসবে।

এই ধারণাটি সব সময় সত্যি নয়, কারণ এটি নির্ভর করে আপনার ঘরের রেগুলেটরের ওপর।

আসুন বিজ্ঞানের সহজ ভাষায় এই বিষয়ের আসল সত্যটি জেনে নেই।

ফ্যান জোরে ঘুরলে বিদ্যুৎ খরচ যেভাবে নির্ধারিত হয়

আমাদের অনেকের বাড়িতেই পুরনো দিনের বড় রেগুলেটর বা নতুন ইলেকট্রনিক রেগুলেটর রয়েছে। ফ্যানের গতি বাড়ানোর সাথে বিদ্যুতের সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই রেগুলেটরের ভেতরে।

যখন আপনি ফ্যান ফুল স্পিডে চালান, তখন ফ্যানের মোটরটি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করে ঘোরে। এই অবস্থায় ফ্যানটি তার গায়ে লেখা নির্দিষ্ট ওয়াট অনুযায়ী বিদ্যুৎ টানে।

তাই স্বাভাবিকভাবেই ফ্যান ফুল স্পিডে চললে বিদ্যুৎ খরচ তার সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়।

ফ্যান রেগুলেটর বিদ্যুৎ বিল ও এর বিজ্ঞান

আগেকার দিনের খটখটে আওয়াজ করা রেগুলেটরগুলো মূলত রেজিস্টর বা প্রতিরোধক দিয়ে তৈরি হতো। এই পুরনো রেগুলেটর দিয়ে ফ্যানের গতি কমালে বিদ্যুৎ মোটেও সাশ্রয় হতো না। কারণ তখন বাড়তি বিদ্যুৎ তাপ শক্তি হিসেবে রেগুলেটরেই নষ্ট হয়ে যেত।

সহজ কথায় ফ্যান ধীর গতিতে চালালেও পুরনো রেগুলেটরের কারণে আপনার পকেট থেকে একই বিল কাটা যেত। তবে বর্তমান সময়ের ছোট প্লাস্টিকের ইলেকট্রনিক রেগুলেটরগুলো সম্পূর্ণ আলাদা প্রযুক্তিতে কাজ করে।

এই আধুনিক রেগুলেটরগুলো ফ্যানের গতি কমালে সত্যিই বিদ্যুৎ প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

ফলে ফ্যান কম স্পিডে চললে আপনার বিদ্যুৎ বিলও অনেক কম আসে।

সিলিং ফ্যান কত ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে?

বাজারে সাধারণত বিভিন্ন ওয়াটের সিলিং ফ্যান পাওয়া যায়। একটি সাধারণ বা সনাতন পদ্ধতির সিলিং ফ্যান সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে। যদি এই ফ্যানটি সারাদিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা একটানা চলে তবে দিনে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে।

মাসের হিসেবে এটি দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ ইউনিট।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ফ্যানের এই খরচ আপনার মোট বিলের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে।

তাই ফ্যান কেনার সময় তার ওয়াট দেখে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিএলডিসি ফ্যান বিদ্যুৎ খরচ ও আধুনিক সমাধান

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এখন বাজারে এসেছে বিএলডিসি বা ব্রাশলেস ডিসি ফ্যান। এই ফ্যানগুলো সাধারণ ফ্যানের তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ খরচ করে। একটি মানসম্মত বিএলডিসি ফ্যান মাত্র ২৮ থেকে ৩৫ ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চলে।

যার মানে হলো সাধারণ ফ্যানের জায়গায় এটি ব্যবহার করলে সরাসরি ৫০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।

বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে এই ফ্যানগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল কমাতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

যদিও এই ফ্যানগুলোর দাম সাধারণ ফ্যানের চেয়ে কিছুটা বেশি তবে এক বছরের মধ্যেই এই টাকা উশুল হয়ে যায়।

বিদ্যুৎ বিল কমানোর উপায় ও কিছু জরুরি পরামর্শ

ফ্যানের কারণে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার পেছনে কিছু অবহেলাও দায়ী থাকে। ফ্যানের ব্লেডে প্রচুর ময়লা জমলে বাতাস কাটতে ফ্যানের মোটরের ওপর বেশি চাপ পড়ে। এর ফলে ফ্যান ধীরে ঘোরে কিন্তু ভেতর থেকে বেশি বিদ্যুৎ টেনে নেয়।

তাই নিয়মিত ফ্যানের ব্লেড পরিষ্কার রাখা উচিত।

ফ্যানের বিয়ারিংয়ে জ্যাম লাগলে বা গ্রিজ শুকিয়ে গেলেও বিদ্যুৎ অপচয় বৃদ্ধি পায়। অনেকে মনে করেন ফ্যানের ক্যাপাসিটর দুর্বল হলে বিদ্যুৎ বেশি খরচ হয়।

আসলে ক্যাপাসিটর দুর্বল হলে ফ্যান ধীরে ঘোরে কিন্তু কারেন্ট আগের মতোই টানে যা পরোক্ষভাবে বিদ্যুতের অপচয় ঘটায়।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন ১: ফ্যান ৫ নম্বরে বা ফুল স্পিডে চালালে কি রেগুলেটর গরম হয়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে?

উত্তর: ইলেকট্রনিক রেগুলেটর ফুল স্পিডে চালালে গরম হয় না কারণ তখন এটি সরাসরি বিদ্যুৎ পাস করে দেয়।

তবে রেগুলেটর কম দামী বা নিম্নমানের হলে অতিরিক্ত লোডের কারণে নষ্ট হতে পারে।

প্রশ্ন ২: রেগুলেটর ছাড়া সরাসরি ডিরেক্ট লাইনে ফ্যান চালালে কি বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে?

উত্তর: ডিরেক্ট লাইনে ফ্যান চালালে ফ্যানটি সবসময় তার সর্বোচ্চ স্পিডে ঘোরে।

মেইন লাইন থেকে এটি তার নির্দিষ্ট ওয়াটের পুরো বিদ্যুৎ খরচ করে যা রেগুলেটর দিয়ে স্পিড কমানোর চেয়ে বেশি বিল তৈরি করে।

প্রশ্ন ৩: এনার্জি সেভিং বা বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারে প্রতি মাসে কত শতাংশ বিদ্যুৎ বাঁচানো সম্ভব?

উত্তর: সাধারণ ফ্যানের তুলনায় বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ বাঁচানো সম্ভব।

প্রশ্ন ৪: একটি ফ্যান সারাদিন-রাত একটানা চললে মাসে আনুমানিক কত টাকা বিল আসতে পারে?

উত্তর: একটি সাধারণ ৮০ ওয়াটের ফ্যান সারাদিন চললে মাসে আপনার বর্তমান ট্যারিফ রেট অনুযায়ী প্রায় ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিল আসতে পারে।

প্রশ্ন ৫: সিলিং ফ্যানের বাতাস কমে গেলে কি কারেন্ট বেশি খরচ হয় নাকি কম?

উত্তর: বাতাস কমে যাওয়ার কারণ যদি জ্যাম বিয়ারিং বা দুর্বল ক্যাপাসিটর হয় তবে কারেন্ট কম খরচ হয় না বরং ফ্যানটি অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় করে।

শেষ কথা

সারসংক্ষেপে বলা যায় আধুনিক ইলেকট্রনিক রেগুলেটর ব্যবহার করলে ফ্যান জোরে ঘুরলে বিদ্যুৎ খরচ অবশ্যই বেশি হবে এবং গতি কমালে বিল কম আসবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হলে আমাদের সচেতনতা ও সঠিক যন্ত্রাংশ নির্বাচন করা প্রয়োজন।

আজই আপনার ঘরের পুরনো রেগুলেটর বদলে আধুনিক রেগুলেটর লাগান এবং সাশ্রয়ী হোন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top