কোন ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ কম

কোন ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ কম? সেরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্রিজ চেনার উপায়

আজকাল প্রতি মাসেই বিদ্যুৎ বিলের কাগজ হাতে পেলে অনেকেরই কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। আমাদের ঘরের সব ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্রের মধ্যে ফ্রিজই একমাত্র যন্ত্র যা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা একটানা চলে। তাই নতুন একটি রেফ্রিজারেটর কেনার আগে সবার মনেই প্রথম প্রশ্ন জাগে, আসলে কোন ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ কম?

সঠিক তথ্য না জেনে ভুল ফ্রিজ কিনলে প্রতি মাসে পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা চলে যায়।

ইনভার্টার ফ্রিজ বনাম নন-ইনভার্টার ফ্রিজের আসল পার্থক্য

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই আমাদের ইনভার্টার প্রযুক্তির কথা মাথায় আসে। একটি সাধারণ বা নন-ইনভার্টার ফ্রিজের কম্প্রেসর কেবল পুরো শক্তিতে চলে অথবা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ফ্রিজের ভেতর পর্যাপ্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেলে কম্প্রেসর বন্ধ হয়ে যায় এবং তাপমাত্রা একটু বাড়লেই আবার পুরো শক্তিতে চালু হয়।

এই বারবার বন্ধ এবং চালু হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ অপচয় হয়।

অন্যপক্ষে একটি ইনভার্টার ফ্রিজ তার কম্প্রেসরের গতি প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

ভেতরের ঠাণ্ডা ঠিক থাকলে এটি একদম কম গতিতে চলতে থাকে, ফলে বাড়তি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না।

বাজারের সাধারণ ফ্রিজের তুলনায় এই প্রযুক্তির ফ্রিজগুলো প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে।

আসলেই কোন ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ কম?

বাজারের হাজারো মডেলের ভিড়ে নির্দিষ্ট করে জানা প্রয়োজন ঠিক কোন ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ কম। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যে ফ্রিজে ইন্টেলিজেন্ট ইনভার্টার টেকনোলজি এবং উন্নত মানের কুলিং সিস্টেম আছে সেটির বিদ্যুৎ খরচ সবচেয়ে কম।

বাংলাদেশের বাজারে এখন ওয়ালটন, যমুনা, স্যামসাং এবং এলজি-র মতো ব্র্যান্ডগুলো দারুণ সব বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী রেফ্রিজারেটর তৈরি করছে।

যেমন আপনি যদি মাঝারি আকারের একটি ভালো ব্র্যান্ডের ইনভার্টার ফ্রিজ ব্যবহার করেন, তবে সেটির বিদ্যুৎ খরচ সাধারণ ফ্রিজের চেয়ে অনেক কম হবে।

দীর্ঘমেয়াদে টাকা বাঁচাতে চাইলে তাই সাধারণ ফ্রিজ না কিনে ইনভার্টার মডেলের দিকে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

৫ স্টার রেটিং ফ্রিজ এবং বিএসটিআই এনার্জি লেবেল

নতুন ফ্রিজ কেনার সময় দরজার গায়ে একটি রঙিন স্টিকার বা লেবেল দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই এই লেবেলটি প্রদান করে। এখানে এক থেকে পাঁচটি তারকা বা স্টার চিহ্ন দেওয়া থাকে।

সহজ নিয়ম হলো, ফ্রিজে যত বেশি স্টার থাকবে সেটি তত বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে।

একটি ৫ স্টার রেটিং ফ্রিজ বছরের সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ইউনিট খরচ করে চলে।

তাই কেনার আগে অবশ্যই স্টিকারটি দেখে নিন এবং বেশি স্টারের ফ্রিজটি নির্বাচন করুন।

ফ্রস্ট বনাম নো-ফ্রস্ট ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ

ফ্রিজ কেনার সময় অনেকেই ফ্রস্ট এবং নো-ফ্রস্টের পার্থক্য নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। ফ্রস্ট বা ডিরেক্ট কুল ফ্রিজের ভেতরে বরফ জমে এবং এটি নির্দিষ্ট সময় পর পর পরিষ্কার করতে হয়। নো-ফ্রস্ট ফ্রিজে ভেতরে কোনো বরফ জমে না, তবে এটি সচল রাখতে বাতাস চলাচলের জন্য ফ্যান এবং হিটার ব্যবহার করা হয়।

অতিরিক্ত হিটার এবং ফ্যান চলার কারণে নো-ফ্রস্ট ফ্রিজে বিদ্যুৎ খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।

অন্যদিকে সাধারণ ফ্রস্ট ফ্রিজে বিদ্যুৎ বিল কিছুটা কম আসে।

আপনার যদি বিদ্যুৎ বিল একবারে সর্বনিম্ন রাখার ইচ্ছা থাকে, তবে ভালো মানের ইনভার্টার ফ্রস্ট ফ্রিজ বেছে নিতে পারেন।

ফ্রিজের বিদ্যুৎ বিল হিসাব করার নিয়ম

আপনার ঘরের ফ্রিজটি মাসে কত টাকার বিদ্যুৎ খাচ্ছে তা আপনি নিজেই হিসাব করতে পারেন। এর জন্য প্রথমে ফ্রিজের পেছনে থাকা স্টিকার থেকে এর ওয়াট দেখে নিতে হবে। যেমন ধরুন, অনেক সময় ওয়ালটন ও স্যামসাং ফ্রিজের ওয়াট ১০০ থেকে ১৫০ ওয়াটের কাছাকাছি হয়ে থাকে।

ধরে নিলাম একটি ইনভার্টার ফ্রিজ গড়ে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পুরো শক্তিতে চলে।

তাহলে ১০০ ওয়াটের একটি ফ্রিজ দিনে ১২০০ ওয়াট-আওয়ার বা ১.২ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করবে। মাসে ৩০ দিন হিসাব করলে মোট খরচ হবে ৩৬ ইউনিট বিদ্যুৎ। একটি পুরানো নন-ইনভার্টার ফ্রিজ মাসে ৫০ থেকে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।

অন্যদিকে একটি নতুন ইনভার্টার ফ্রিজ মাসে মাত্র ১৫ থেকে ২৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে।

এখন ডেসকো বা ডিপিডিসির বর্তমান ট্যারিফ অনুযায়ী প্রতি ইউনিটের দাম দিয়ে গুণ করলেই মাসিক টাকার হিসাব বের হয়ে আসবে।

বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কিছু সহজ উপায়

আমার এক আত্মীয়ের বাসায় বেশ পুরানো একটি নন-ইনভার্টার ফ্রিজ ছিল। সেটির কারণে প্রতি মাসে তাদের প্রায় ৫০০ টাকার ওপরে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল আসত। পরবর্তীতে তারা একটি নতুন ইনভার্টার প্রযুক্তির ফ্রিজ কেনেন এবং বিল এক ধাক্কায় প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়।

তবে শুধু ভালো ফ্রিজ কিনলেই হবে না, ব্যবহারের কিছু নিয়মও মেনে চলতে হবে।

ফ্রিজের পেছনের অংশটি দেয়াল থেকে অন্তত ৬ ইঞ্চি দূরে রাখা উচিত যেন গরম বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে।

ফ্রিজের দরজা বারবার খোলা এবং অনেক সময় ধরে খোলা রাখা যাবে না। ভেতরে গরম খাবার সরাসরি রেখে দিলে ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কম্প্রেসরকে বেশি খাটতে হয়, যা বিল বাড়িয়ে দেয়।

ফ্রিজের ভেতরের থার্মোস্ট্যাট বা রেগুলেটর সবসময় মাঝারি লেভেলে অর্থাৎ ২ বা ৩ নম্বরে সেট করে রাখা ভালো।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

১. রাতে ফ্রিজ বন্ধ করে রাখলে কি বিদ্যুৎ বিল কমে?

এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা এবং এর ফলে উল্টো বিল বেশি আসতে পারে।

রাতে ফ্রিজ বন্ধ রাখলে ভেতরের জিনিসপত্র গরম হয়ে যায় এবং সকালে চালু করলে ফ্রিজ ঠাণ্ডা করতে কম্প্রেসরকে দ্বিগুণ কাজ করতে হয়।

২. ফ্রিজে অতিরিক্ত বরফ জমলে কি সমস্যা হয়?

ফ্রিজের দেওয়ালে অতিরিক্ত বরফ জমলে ভেতরের ঠাণ্ডা বাতাস ঠিকমতো ছড়াতে পারে না।

এর ফলে কম্প্রেসর একটানা চলতে বাধ্য হয় এবং বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যায়।

৩. ইনভার্টার ফ্রিজের বাড়তি দাম কি আসলেই উসুল হয়?

হ্যাঁ, ইনভার্টার ফ্রিজের দাম সাধারণ ফ্রিজের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে সেই টাকা উসুল হয়ে যায়।

৪. ছোট ফ্রিজ আর বড় ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচে কেমন পার্থক্য হয়?

ফ্রিজের সাইজ বা লিটার ধারণক্ষমতা যত বড় হবে, তার ভেতরের জায়গা ঠাণ্ডা রাখতে তত বেশি বিদ্যুৎ লাগবে।

তাই পরিবারের সদস্য সংখ্যা বিবেচনা করে সঠিক আকারের ফ্রিজ কেনা উচিত।

৫. ফ্রিজের দরজার রাবার নষ্ট হলে কি বিল বাড়ে?

ফ্রিজের দরজার রাবার বা গাস্কেট ঢিলে হয়ে গেলে ভেতরের ঠাণ্ডা হাওয়া বাইরে বের হয়ে যায়।

এর ফলে ফ্রিজ সহজে ঠাণ্ডা হয় না এবং বিল হুহু করে বাড়তে থাকে।

শেষ কথা

নতুন ফ্রিজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধুমাত্র গায়ের দাম না দেখে দীর্ঘমেয়াদি খরচের কথা ভাবা দরকার। সঠিক প্রযুক্তির একটি ফ্রিজ আপনার সংসারের অনেক বড় একটি খরচ বাঁচিয়ে দিতে পারে।

আশা করি এই তথ্যগুলো আপনাকে আপনার ঘরের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী রেফ্রিজারেটরটি বেছে নিতে সাহায্য করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top