প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কি

প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কি? জানুন ‘দি একাডেমি’র ইতিহাস ও অজানা তথ্য

জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রাচীন চারণভূমি গ্রিস দেশের নাম আমরা সবাই জানি। প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটোর নাম শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কি?

আজকে আমরা এই ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ইতিহাসের পাতা ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র থেকে আমরা এর সত্যতা যাচাই করব।

প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কি ও এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়

দর্শনের ইতিহাসে এই মহান চিন্তাবিদের অবদান চিরস্মরণীয়। অনেকে জানতে চান প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কি এবং এর পরিচয় কেমন ছিল। প্লেটোর প্রতিষ্ঠিত সেই কালজয়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘দি একাডেমি’ বা ‘প্লেটোর একাডেমি’।

এটি ছিল মূলত এথেন্সের একাডেমি যা জ্ঞানচর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত নায়ক ‘আকাডেমোস’ এর নামানুসারে এই জায়গার নামকরণ করা হয়েছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৭ অব্দে এথেন্স শহরের উপকণ্ঠে একটি জলপাই বাগানে এটি গড়ে ওঠে।

একাডেমি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ও পটভূমি

প্লেটোর এই উদ্যোগের পেছনে একটি বড় আবেগ কাজ করেছিল। তাঁর প্রিয় শিক্ষক সক্রেটিসকে তৎকালীন সমাজ বিষ খাইয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। শিক্ষকের এই মর্মান্তিক মৃত্যু তরুণ প্লেটোর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সমাজের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনি ‘দার্শনিক রাজা’ তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

তৎকালীন সময়ে কিছু ব্যবসায়ী শিক্ষক ছিলেন যাদের সোফিস্ট বলা হতো।

টাকার বিনিময়ে লোক দেখানো বিদ্যা বিক্রির এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্লেটোর একাডেমি ছিল একটি প্রতিবাদ।

প্রাচীন গ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্লেটোর শিক্ষা দর্শন

প্লেটোর শিক্ষা দর্শন কেবল মুখস্থ বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষা মানুষের আত্মাকে আলোকিত করে। এই প্রাচীন গ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো নির্দিষ্ট ফি বা বেতন নেওয়ার নিয়ম ছিল না।

শিক্ষক ও ছাত্ররা এখানে এক পরিবারের মতো বসবাস করতেন এবং জ্ঞানচর্চার আলো ছড়াতেন। প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্লেটোর দ্য রিপাবলিক’ এ তাঁর এই শিক্ষা ভাবনার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

প্রধান বিষয়সমূহ এবং জ্যামিতির অনন্য শর্ত

এখানে মূলত দর্শন, রাজনীতি, গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা পড়ানো হতো। এই প্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বারে একটি বিশেষ বাণী লেখা ছিল। সেখানে লেখা ছিল, “যার জ্যামিতির জ্ঞান নেই, সে যেন এখানে প্রবেশ না করে।”

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্লেটো মনে করতেন গণিত মানুষের যৌক্তিক চিন্তাভাবনা তৈরি করে।

তাঁদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল সক্রেটিক মেথড বা পারস্পরিক কথোপকথন।

ইতিহাসের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্লেটোর একাডেমি

অনেক ইতিহাসবিদ এটিকে ইউরোপ তথা ইতিহাসের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এর কারণ হলো এখানে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা করা হতো। এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করতেন

বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষকদের তথ্যমতে, এই প্রতিষ্ঠানটি প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল।

অ্যারিস্টটলের শিক্ষাগুরু ও একাডেমির বিখ্যাত ব্যক্তিত্বগণ

প্লেটোর একাডেমির সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন অ্যারিস্টটল। প্লেটো ছিলেন অ্যারিস্টটলের শিক্ষাগুরু এবং অ্যারিস্টটল এখানে দীর্ঘ ২০ বছর অধ্যয়ন করেন। অ্যারিস্টটল ছাড়াও এখানে ইউডক্সাস এবং থিয়েটেটাসের মতো প্রখ্যাত গণিতবিদরা ছিলেন।

আরেকটি চমৎকার বিষয় হলো, তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে এখানে নারীদেরও শিক্ষার সুযোগ ছিল।

লাস্থেনিয়া এবং অক্সিওথিয়া নামের দুজন নারী পুরুষ সেজে এখানে বিদ্যা অর্জন করেছিলেন।

প্লেটোর একাডেমির পতন ও ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া

প্লেটোর মৃত্যুর পরও এই প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর টিকে ছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে এর মূল আদর্শ কিছুটা ম্লান হয়ে যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৮৬ অব্দে রোমান জেনারেল সুলা এথেন্স আক্রমণ করে এই একাডেমির ব্যাপক ক্ষতি করেন।

সবশেষে ৫২৯ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। সম্রাট জাস্টিনিয়ান এটিকে পৌত্তলিক বা অখ্রিস্টান সংস্কৃতির কেন্দ্র বলে মনে করতেন।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিশ্বকোষের মতে, এর মাধ্যমে প্রায় নয়শত বছরের এক গৌরবময় ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিসিএস বা অন্যান্য চাকুরির পরীক্ষায় এই বিষয় থেকে প্রায়ই প্রশ্ন আসে। প্লেটোর শিক্ষাগুরু ছিলেন সক্রেটিস। আবার প্লেটো ছিলেন অ্যারিস্টটলের শিক্ষাগুরু। অ্যারিস্টটল পরবর্তীতে এথেন্সে ‘লাইসিয়াম’ নামের আরেকটি বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

এই তিনটি নাম এবং তাঁদের সম্পর্ক মনে রাখা পরীক্ষার জন্য বেশ সহায়ক হতে পারে।

প্রচলিত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১: প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কি?

উত্তর: প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘দি একাডেমি’ (The Academy)।

প্রশ্ন ২: প্লেটোর একাডেমি কোথায় অবস্থিত ছিল?

উত্তর: এটি প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ছিল।

প্রশ্ন ৩: প্লেটোর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কত বছর স্থায়ী হয়েছিল?

উত্তর: এটি বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৯০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল।

প্রশ্ন ৪: অ্যারিস্টটলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কী ছিল?

উত্তর: অ্যারিস্টটলের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘লাইসিয়াম’ (Lyceum)।

প্রশ্ন ৫: একাডেমির প্রবেশদ্বারে কী লেখা ছিল?

উত্তর: এর প্রবেশদ্বারে লেখা ছিল যে, জ্যামিতি না জানলে কেউ যেন সেখানে প্রবেশ না করে।

শেষ কথা

প্লেটোর একাডেমি মানুষের মুক্তচিন্তার এক অনন্য স্মারক। আজকে আমরা প্লেটোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম কি এবং এর গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জানলাম। প্রাচীন যুগের এই আলো আজকেও আমাদের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনুপ্রাণিত করে।

মানুষের জানার আগ্রহ এবং সত্যের সন্ধানই এই পৃথিবীর প্রকৃত সম্পদ।

Authority Sources: Stanford Encyclopedia of Philosophy, Britannica Encyclopedia, World History Encyclopedia.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top