সন্তানের প্রতি পিতা মাতার হক কয়টি ও কি কি? জেনে নিন বিস্তারিত

পারিবারিক জীবনে আমরা সাধারণত পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে বেশি আলোচনা করি। কিন্তু ইসলামে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতারও সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। একেই বলা হয় সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার হক।

আমি নোমান সৈয়দ শামসুল, দীর্ঘ দিন ধরে ইসলামিক পারিবারিক জীবন এবং সন্তান প্রতিপালন বিষয়ে গবেষণা করছি। আমার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আপনাদের সামনে সহজভাবে তুলে ধরব। অনেকেই জানতে চান সন্তানের প্রতি পিতা মাতার হক কয়টি। চলুন আজ আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ে পরিষ্কার একটি ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করি।

সন্তানের প্রতি পিতা মাতার হক কয়টি?

ইসলামে সন্তানের অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ইসলামিক স্কলার সন্তানের প্রধান হক বা অধিকারকে ৫টি বা ৭টি ভাগে ভাগ করেছেন। তবে মূল বিষয় হলো, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে থেকে শুরু করে তার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পিতা-মাতার কিছু দায়িত্ব রয়েছে।

পিতা মাতার হক
পিতা মাতার হক

আমি আমার গবেষণায় দেখেছি, মূলত ৫টি প্রধান হক বা অধিকার নিশ্চিত করা প্রত্যেক পিতা-মাতার জন্য আবশ্যক। নিচে এই প্রধান হকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

সন্তানের প্রধান ৫টি হক ও অধিকার

১. সুন্দর ও অর্থপূর্ণ নাম রাখা

সন্তানের জন্মের পর তার জন্য একটি সুন্দর এবং অর্থবোধক নাম রাখা পিতা-মাতার প্রথম কর্তব্য। একটি সুন্দর নাম সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদের নিজের নাম ও পিতার নামে ডাকা হবে। তাই তোমরা সুন্দর নাম রাখো (সুনানে আবু দাউদ)।

২. সঠিক শিক্ষা ও নৈতিকতা প্রদান (তারবিয়াহ)

সন্তানকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিলেই হবে না। তাকে দ্বীনি শিক্ষা এবং ভালো নৈতিকতা শেখানো পিতা-মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আমি অনেক পরিবারে দেখেছি, সঠিক নৈতিক শিক্ষার অভাবে সন্তানরা বড় হয়ে বিপথে যায়। সন্তানকে সৎ, ভদ্র এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা পিতা-মাতার বড় হক।

৩. হালাল উপার্জনে লালন-পালন করা

সন্তানকে বড় করার জন্য যে খরচ প্রয়োজন, তা অবশ্যই হালাল টাকা দিয়ে করতে হবে। হারাম উপার্জনের খাদ্য সন্তানের মন-মানসিকতার ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। সন্তানকে নিরাপদ আশ্রয়, পোশাক এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়া পিতা-মাতার দায়িত্ব।

৪. সব সন্তানের প্রতি সমান আচরণ করা

আপনার একাধিক সন্তান থাকলে তাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। ছেলে বা মেয়ে সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে। আদর, উপহার বা সম্পদের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখা পিতা-মাতার কর্তব্য। হাদিস শরিফে এসেছে, “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ বা সমতা কায়েম করো” (সহীহ বুখারী)।

৫. উপযুক্ত বয়সে বিয়ের ব্যবস্থা করা

সন্তান যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে এবং বিয়ের উপযুক্ত হবে, তখন তার জন্য ভালো জীবনসঙ্গী খুঁজে বিয়ের ব্যবস্থা করা পিতা-মাতার দায়িত্ব। এটি সন্তানকে চরিত্রহীনতা ও সামাজিক অপরাধ থেকে রক্ষা করে।

এক নজরে সন্তানের প্রধান হকসমূহ

পাঠকদের সহজে বোঝার সুবিধার্থে আমি নিচে একটি টেবিল তৈরি করে দিলাম:

হকের ধরন প্রধান কাজ সংক্ষিপ্ত বিবরণ
জন্মের পর সুন্দর নাম ও আকিকা অর্থপূর্ণ নাম রাখা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
শৈশব ও কৈশোর শিক্ষা ও নৈতিকতা দ্বীনি শিক্ষা এবং ভালো আচরণ শেখানো।
প্রতিদিনের জীবন হালাল খাবার ও আশ্রয় হালাল উপার্জনের মাধ্যমে সন্তানের ভরণপোষণ করা।
মানসিক অধিকার সমান ভালোবাসা সন্তানদের মাঝে কোনো বৈষম্য না করা।
যৌবনকাল বিয়ের ব্যবস্থা সঠিক সময়ে আদর্শ পাত্র বা পাত্রী দেখে বিয়ে দেওয়া।
শেষ কথা

সন্তান আল্লাহর দেওয়া একটি পবিত্র আমানত। আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি আমাদের সন্তানদের এই হকগুলো সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিতে পারি, তবে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদের জন্য কল্যাণের কারণ হবে। সন্তানের প্রতি পিতা মাতার হক কয়টি—এই প্রশ্নের উত্তর জানার পাশাপাশি আমাদের উচিত এগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে সন্তান প্রতিপালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top