মা বাবা হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। কিন্তু এই আনন্দের সাথে আসে বড় দায়িত্ব। অনেকে আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, ইসলামে সন্তানের হক কয়টি? আমি স্যার, নোমান সৈয়দ শামসুল, দীর্ঘ বছর ধরে পারিবারিক বিষয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করছি। আমার এই কাজের অভিজ্ঞতার জার্নিতে আমি দেখেছি, অনেক মা বাবাই সন্তানের সঠিক অধিকারগুলো পুরোপুরি জানেন না। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে তাদের অধিকারগুলো জানা জরুরি। আজ আমি এই বিষয়ে সঠিক তথ্য ও রেফারেন্সসহ সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

ইসলামে সন্তানের অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইসলামে পরিবারকে অনেক বড় স্থান দেওয়া হয়েছে। সন্তানরা হলো আল্লাহর দেওয়া আমানত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন:
“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৫৪৬)
আমার দীর্ঘ গবেষণায় আমি দেখেছি, যে পরিবারে সন্তানের অধিকারগুলো সঠিকভাবে দেওয়া হয়, সেই সন্তানরা জীবনে অনেক বেশি সফল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।
সন্তানের হক কয়টি ও কি কি?
ইসলামী স্কলারদের মতে, সন্তানের প্রধান হক বা অধিকার মূলত ৭টি। এই অধিকারগুলো সন্তানের জন্মের আগে থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। নিচে এই ৭টি হক সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
১. উত্তম জীবনসঙ্গী বা মা-বাবা নির্বাচন
এটি সন্তানের জন্মের আগের হক। সন্তান যেন একটি ভালো পরিবেশ পায়, সেজন্য বিয়ের আগেই একজন সৎ এবং চরিত্রবান জীবনসঙ্গী বেছে নিতে হয়। আমি আমার কাউন্সিলিং ক্যারিয়ারে দেখেছি, মা-বাবার ভালো বোঝাপড়া সন্তানের মানসিক বিকাশে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
২. সুন্দর ও অর্থপূর্ণ নাম রাখা
সন্তানের জন্মের পর তার জন্য একটি সুন্দর ও অর্থপূর্ণ নাম রাখা মা-বাবার প্রধান দায়িত্ব। নামের প্রভাব মানুষের ব্যক্তিত্বের ওপর পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও তোমাদের বাপের নামে ডাকা হবে। তাই তোমাদের নামগুলো সুন্দর রাখো। (সুনানে আবু দাউদ)
৩. আকিকা করা
সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। এর মাধ্যমে সন্তানের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়। ছেলের জন্য দুটি এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল বা ভেড়া জবাই করে আকিকা দিতে হয়।
৪. স্নেহ-ভালোবাসা ও যত্ন পাওয়া
সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, বুকে জড়িয়ে ধরা এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা তাদের মানসিক অধিকার। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) শিশুদের অনেক ভালোবাসতেন। তিনি সন্তানদের চুম্বন করতেন এবং তাদের সাথে খেলা করতেন।
৫. দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান
সন্তানকে শুধু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই হবে না। তাদের সৎ চরিত্র, নৈতিকতা এবং ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার অন্যতম বড় দায়িত্ব। আমি সবসময় মা-বাবাদের বলি, সন্তানকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিন।
৬. সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করা
আপনার একাধিক সন্তান থাকলে তাদের মাঝে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। আদর, উপহার বা সম্পদের ক্ষেত্রে সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে। সন্তানদের মধ্যে তুলনা করলে তাদের মনে হিংসার সৃষ্টি হয়, যা আমি অনেক পরিবারে দেখেছি।
৭. স্বাবলম্বী করা ও বিয়ের ব্যবস্থা করা
সন্তান যখন বড় হবে, তখন তাকে হালাল উপার্জনের পথ তৈরি করে দেওয়া এবং উপযুক্ত বয়সে বিয়ে দেওয়া মা-বাবার দায়িত্ব। এর মাধ্যমে সন্তান সমাজে একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবন কাটাতে পারে।
এক নজরে সন্তানের প্রধান অধিকারসমূহ
পাঠকদের সুবিধার্থে আমি নিচে একটি টেবিল তৈরি করে দিলাম, যা থেকে আপনারা সহজেই সন্তানের হকগুলো মনে রাখতে পারবেন।
| ক্রমিক | সন্তানের প্রধান হক বা অধিকার | অধিকারের সময়কাল |
| ১ | উত্তম মা/বাবা নির্বাচন | জন্মের পূর্বে |
| ২ | সুন্দর ও অর্থপূর্ণ নাম রাখা | জন্মের ৭ম দিনে |
| ৩ | আকিকা করা ও চুল কাটা | জন্মের ৭ম দিনে |
| ৪ | স্নেহ, ভালোবাসা ও সঠিক লালন-পালন | শৈশবকাল |
| ৫ | দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া | শৈশব থেকে কৈশোর |
| ৬ | সব সন্তানের মাঝে সমতা বজায় রাখা | সারাজীবন |
| ৭ | উপযুক্ত বয়সে বিয়ের ব্যবস্থা করা | যৌবনকাল |
শেষ কথা
সন্তানের হক কয়টি তা জানা যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা জীবনে বাস্তবায়ন করা। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যে মা-বাবা এই দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করেন, বৃদ্ধ বয়সে তারা সন্তানদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ও সম্মান পান।
আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের হকগুলো সঠিকভাবে পূরণ করি এবং তাদের একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি। এই বিষয়ে আপনার কোনো মতামত বা প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করে আমাকে জানাতে পারেন।
গ্রামীণ সমাজসেবা কত সালে চালু হয় বিস্তারিত জানার জন্য এখানে প্রবেশ করুন।





