আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থীর মনেই একটি সাধারণ ধারণা বাসা বেঁধে থাকে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করলে বোধহয় বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আজকাল প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন পূরণ করছেন।
সহজ কিছু নিয়ম আর সঠিক নির্দেশনার অভাবই কেবল অনেককে পিছিয়ে রাখে।
এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব কীভাবে একজন এনইউ শিক্ষার্থী নিজেকে আন্তর্জাতিক স্তরের জন্য প্রস্তুত করতে পারেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি আসলেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা সম্ভব?
অনেক শিক্ষার্থীই নিজেদের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। বাস্তবতা হলো, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপনার কলেজের ব্র্যান্ডিংয়ের চেয়ে আপনার ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে বেশি মূল্যায়ন করে।
গ্লোবাল অ্যাডমিশন প্রসেস মূলত “হোলিস্টিক রিভিউ” বা সামগ্রিক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে চলে।
সেখানে আপনার সিজিপিএ, ভাষাগত দক্ষতা এবং গবেষণার আগ্রহকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।
ঢাকা কলেজ বা ইডেন কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে পড়েও অনেকে এখন আমেরিকার টপ ইউনিভার্সিটিতে ফুল ফান্ডিং নিয়ে পড়ছেন।
অনেকে মনে করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া অসম্ভব, কিন্তু এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
তাই নিজের মেধার ওপর বিশ্বাস রাখা প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের প্রাথমিক যোগ্যতা
বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়।
আসুন জেনে নিই সেই মূল বিষয়গুলো কী কী।
সিজিপিএ (CGPA) এর গুরুত্ব ও সেফ জোন
মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য সাধারণত সিজিপিএ ৩.২৫ বা তার বেশি থাকলে খুব ভালো হয়।
তবে সিজিপিএ ৩.০০ এর নিচে হলেও আশাহত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সেক্ষেত্রে অন্যান্য প্রোফাইল এলিমেন্ট যেমন আইইএলটিএস বা কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তা কভার করা সম্ভব।
ভাষাগত দক্ষতা: IELTS এবং MOI certificate National University
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হলো আইইএলটিএস (IELTS)।
সাধারণত নূন্যতম স্কোর ৬.০ থেকে ৬.৫ থাকলে ইউরোপ বা আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা যায়।
অনেকে জানতে চান আইইএলটিএস ছাড়া কি আবেদন করা সম্ভব?
হ্যাঁ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করার জন্য MOI certificate National University থেকে সংগ্রহ করে কিছু দেশে আবেদন করা যায়।
ইউকে বা লাটভিয়ার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এই মিডিয়াম অফ ইনস্ট্রাকশন (MOI) সার্টিফিকেট গ্রহণ করে।
তবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে একটি ভালো আইইএলটিএস স্কোর থাকা সবচেয়ে নিরাপদ।
জিআরই (GRE) বা জিমেট (GMAT) এর প্রয়োজনীয়তা
আপনি যদি আমেরিকা বা কানাডার ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল ফান্ডিং পেতে চান, তবে জিআরই অনেক সাহায্য করবে।
একটি ভালো জিআরই স্কোর আপনার কম সিজিপিএ-এর ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে।
৩ বছর মেয়াদি পাস কোর্স বনাম ৪ বছর মেয়াদি অনার্স: বিদেশে আবেদনের ভিন্নতা
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ধরনের ব্যাচেলর ডিগ্রি কোর্স প্রচলিত আছে।
এর একটি হলো ৪ বছর মেয়াদি অনার্স এবং অন্যটি ৩ বছর মেয়াদি পাস কোর্স বা ডিগ্রি।
বিদেশে আবেদনের ক্ষেত্রে এই দুই কোর্সের জন্য নিয়ম কিছুটা আলাদা হয়।
৪ বছর মেয়াদি অনার্সের পর সরাসরি মাস্টার্স বা পিএইচডি
যারা ৪ বছরের অনার্স সম্পন্ন করেছেন, তাদের ১৬ বছরের শিক্ষা পূর্ণ হয়।
তারা সরাসরি ইউএসএ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের যেকোনো দেশে মাস্টার্সে আবেদন করতে পারেন।
এমনকি সরাসরি পিএইচডিতে আবেদনের সুযোগও কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকে।
৩ বছর মেয়াদি ডিগ্রির (পাস কোর্স) পর করণীয়
৩ বছরের ডিগ্রির ক্ষেত্রে মোট শিক্ষার বছর হয় ১৫ বছর। আমেরিকা বা কানাডার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি ১৫ বছরের শিক্ষাকে মাস্টার্সের জন্য গ্রহণ করে না।
এর সমাধান হিসেবে আপনি বাংলাদেশ থেকে ১ বছরের মাস্টার্স সম্পন্ন করে ১৬ বছর পূর্ণ করতে পারেন।
অথবা বিদেশে সরাসরি “প্রি-মাস্টার্স” (Pre-Masters) কোর্সের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারেন।
এছাড়া ইউকে বা জার্মানির কিছু নির্দিষ্ট কোর্স ৩ বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রিকেও সরাসরি গ্রহণ করে।
NU WES evaluation process: সিজিপিএ মূল্যায়ন পদ্ধতি
আমেরিকা বা কানাডায় উচ্চশিক্ষার জন্য কেন ইসিএ (ECA) বা ওয়েস (WES) মূল্যায়ন প্রয়োজন তা জানা জরুরি।
এটি মূলত আপনার বাংলাদেশের সিজিপিএ-কে আন্তর্জাতিক ৪.০০ স্কেলে রূপান্তর করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডব্লিউইএস করানোর একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
প্রথমে আপনাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজীপুর মেইন ক্যাম্পাস থেকে অফিশিয়াল ট্রান্সক্রিপ্ট ও সার্টিফিকেট ভেরিফাই করাতে হবে।
এরপর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে সেই ভেরিফাইড ডকুমেন্টসগুলো একটি বিশেষ খামে সিলগালা করে নিতে হয়।
এই সিলগালা করা খামটি সরাসরি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে WES ঠিকানায় পাঠাতে হয়।
এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারশিপ ও সেরা ফান্ডিং প্রোগ্রামসমূহ
এনইউ শিক্ষার্থীরা বিশ্বজুড়ে নামী দামী বেশ কিছু স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে পারেন।
আসুন সেরা কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের ব্যাপারে জেনে নিই।
| স্কলারশিপের নাম | দেশ/অঞ্চল | মূল সুবিধা |
| ইরাসমাস মুন্ডুস | ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন | সম্পূর্ণ ফ্রি টিউশন ফি ও মাসিক স্টাইপেন্ড |
| ড্যাড (DAAD) | জার্মানি | ফ্রি পড়াশোনা এবং লিভিং কস্ট কভারেজ |
| ফুলব্রাইট ও চেভেনিং | ইউএসএ ও ইউকে | সম্পূর্ণ সরকারি স্পনসরশিপ ও লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট |
| সরকারি স্কলারশিপ | চীন, তুরস্ক ও ইতালি | আংশিক বা সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ ও আবাসন সুবিধা |
ইউরোপের ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের জন্য সিজিপিএ-এর চেয়ে আপনার স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP) এবং কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ পাওয়া মোটেও অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।
এনইউ থেকে বিদেশে মাস্টার্স করার জন্য প্রোফাইল ভারী করার বিশেষ কৌশল
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গবেষণার সুযোগ কম থাকা।
এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য কিছু স্মার্ট স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করা যেতে পারে।
আপনি চাইলে অন্য কোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটির প্রফেসরের সাথে যোগাযোগ করে কোনো রিসার্চ প্রজেক্টে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতে পারেন।
অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন রিসার্চ টিমের সাথে যুক্ত হয়ে নিজের রিসার্চ পেপার বা পাবলিকেশন তৈরি করতে পারেন।
এছাড়া অনার্স চলাকালীন সময়েই আইইএলটিএস পরীক্ষা শেষ করে রাখলে সেশন জটের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়।
বিদেশের কোনো প্রফেসরের কাছ থেকে ফান্ডিং পাওয়ার জন্য একটি প্রফেশনাল সিভি তৈরি করে কোল্ড ইমেইলিং (Cold Emailing) করা অত্যন্ত কার্যকর।
প্রশ্ন ১: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি সত্যিই ফুল ফ্রি স্কলারশিপ পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, সঠিক প্রোফাইল এবং ভালো আইইএলটিএস স্কোর থাকলে অবশ্যই ফুল ফ্রি স্কলারশিপ পাওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন ২: আমার সিজিপিএ ৩.০০ এর কম হলে কি আমি বিদেশে যেতে পারব?
অবশ্যই পারবেন, সেক্ষেত্রে আপনাকে ভালো আইইএলটিএস বা জিআরই স্কোর এবং শক্তিশালী এসওপি (SOP) তৈরি করতে হবে।
প্রশ্ন ৩: এনইউ থেকে বিদেশে মাস্টার্স করার জন্য আইইএলটিএস কি বাধ্যতামূলক?
বেশিরভাগ দেশের জন্য এটি বাধ্যতামূলক, তবে কিছু নির্দিষ্ট দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এমওআই (MOI) সার্টিফিকেট গ্রহণ করে থাকে।
প্রশ্ন ৪: সেশন জটের কারণে স্টাডি গ্যাপ তৈরি হলে কি ভিসায় সমস্যা হয়?
না, যদি আপনি সিভিতে দেখাতে পারেন যে ওই সময়ে আপনি কোনো চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং বা স্কিল ডেভেলপমেন্টের সাথে যুক্ত ছিলেন।
প্রশ্ন ৫: পাস কোর্সের শিক্ষার্থীরা কোন কোন দেশে সরাসরি আবেদন করতে পারেন?
যুক্তরাজ্য (UK) এবং ইউরোপের কিছু দেশে ৩ বছরের ডিগ্রি সরাসরি গ্রহণ করা হয়, অন্যথায় প্রি-মাস্টার্স বা বাংলাদেশে ১ বছরের মাস্টার্স করে আবেদন করতে হবে।
উপসংহার ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
পরিশেষে বলা যায়, আপনার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় আপনার স্বপ্নের পরিধি নির্ধারণ করে না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা আপনার মেধা, ধৈর্য এবং সঠিক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে।
অনার্স প্রথম বর্ষ থেকেই একটু একটু করে নিজের প্রোফাইল বিল্ডআপ করা শুরু করুন।
সহজ ভাষায় নিজের স্বপ্নকে সাজান এবং লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকুন।

আমি Md. Thouhidul Islam একজন ডেডিকেটেড কন্টেন্ট রাইটার ও প্রযুক্তিপ্রেমী। আপনারা হয়তো আমাকে ইতিমধ্যে অনেকেই চিনেন। আমি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ‘প্রযুক্তি ও কৌশল‘ এবং ‘শিক্ষা ও জীবন‘ বিষয়ে নিখুঁত ও তথ্যবহুল কনটেন্ট তৈরি করছি।
জটিল পড়াশোনা, টেকনিক্যাল বিষয় ও ডিজিটাল ট্রিকসগুলোকে সহজ এবং সাবলীল বাংলায় পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করাই আমার একমাত্র মূল বৈশিষ্ট্য। প্রিয় পাঠক, আমি সবসময় কোনো প্রকার কপি-পেস্ট ছাড়া গভীর গবেষণার মাধ্যমে পাঠকদের কাছে শতভাগ খাঁটি ও কার্যকরী তথ্য পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপনারা আমার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ!





