বেলে মাটিতে কি কি ফসল হয় বিস্তারিত

বেলে মাটিতে কি কি ফসল হয়

বেলে মাটি অনেকের কাছে দুর্বল মনে হলেও আমার অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক পরিকল্পনা নিলে এই মাটিই অসাধারণ ফলন দিতে পারে। বাংলাদেশে নদীর পাড়, চরাঞ্চল বা বন্যা পরবর্তী এলাকায় এই ধরনের মাটি বেশি দেখা যায়। বেলে মাটির গঠন আলগা হওয়ায় ফসলের শিকড় দ্রুত নড়াচড়া করতে পারে। যদিও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কম হওয়ায় সেচ দিতে হয় একটু কৌশলে। তাই আমি এখানে এমনভাবে ব্যাখ্যা করছি, যাতে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন। বেলে মাটিতে কোন কোন ফসল সবচেয়ে বেশি ভালো হয়, এবং কীভাবে এই মাটিতে চাষ করলে ফলন বাড়ানো সম্ভব।

বেলে মাটির বৈশিষ্ট্য

বেলে মাটির দানাগুলো বড় হওয়ায় পানি নিচে নেমে যায় দ্রুত, আর সেই কারণেই এর জলধারণ ক্ষমতা কম। তবে এই বৈশিষ্ট্যই আবার কিছু ফসলের জন্য উপকারী। কারণ পানি না জমলে অনেক রোগের আক্রমণও কম হয়। আরেকটা বিষয় হলো এ মাটিতে বাতাস চলাচল ভালো হয়, তাই শিকড় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং গাছটিও শক্ত হয়। তবে যেহেতু এটি পুষ্টি শক্ত করে ধরে রাখতে পারে না। তাই সার একবারে না দিয়ে ভাগ করে প্রয়োগ করা হলে ফলন তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। মাটি দ্রুত গরম হয় বলেও কিছু মৌসুমি সবজি ও ফল ভালো জন্মে।

বেলে মাটিতে ফসল চাষের উপযোগিতা

বেলে মাটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো শিকড়ের অবাধ বিকাশ। মাটির আলগা গঠন শিকড়কে দ্রুত নিচে প্রবেশ করতে দেয়, ফলে মূলজাত ফসল যেমন: গাজর, মুলো, আলু প্রাকৃতিকভাবে ভালো জন্মে। এমন ফসল যেগুলোর গোড়ায় পানি জমে থাকা বিরূপ প্রভাব ফেলে, তারা বেলে মাটিতে দারুণ বেড়ে ওঠে। আবার এ মাটির দ্রুত গরম হয়ে ওঠার ক্ষমতা গ্রীষ্মমুখী লতা জাতীয় ফসল। যেমন তরমুজ, বাঙ্গি ইত্যাদির বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

সবজি জাতীয় ফসল

সবজি চাষের ক্ষেত্রে বেলে মাটি খুবই সম্ভাবনাময়। আলু এই মাটিতে অসাধারণ ফলন দেয়। কারণ নরম মাটিতে কন্দ সহজে ফুলে ওঠে। গাজর ও মুলোও তেমনি তাদের লম্বা মূল নিচে নেমে যাওয়ার জন্য এ মাটি বেশি উপযোগী। টমেটো এবং শসার মতো সবজিও বেলে মাটিতে ভালো বাড়ে। কারণ পানি সহজে বেরিয়ে যায় বলে গাছের শিকড় পচে না। এমনকি মিষ্টিকুমড়া বা বরবটির মতো লতা জাতীয় সবজিগুলোও এ মাটিতে দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

বেলে মাটিতে গাজর ও মুলোর মূলজাত
বেলে মাটিতে গাজর ও মুলোর মূলজাত

 

ফলজাত ফসল

বেলে মাটির কথা উঠলে প্রথমেই আমার মনে পড়ে তরমুজের কথা। কারণ তরমুজ বেলে মাটি ছাড়া অন্য কোথাও এত ভালোভাবে ফলন দেয় না। মাটির নরমত্ব এবং দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা এ ফলের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। একইভাবে বাঙ্গি, ক্যান্টালুপ বা বাঙেরির মতো গ্রীষ্মকালীন ফলও এই মাটিতে দারুণ বাড়ে। পেঁপের শিকড়ও গভীরভাবে বিস্তার লাভ করে বলে বেলে মাটিতে এ ফলটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আনারসের ক্ষেত্রেও দেখা যায় ড্রেনেজ ভালো এমন জমি, অর্থাৎ বেলে মাটি, আনারসের জন্য বেশ উপযোগী।

শস্য ও ঐতিহ্যবাহী ফসল

বাংলাদেশে বেলে জমিতে চিনাবাদাম চাষ সবচেয়ে বেশি লাভজনক হয়ে থাকে। মাটির আলগা বৈশিষ্ট্য চিনাবাদামের খোল গঠনে সাহায্য করে এবং ফলনও ভালো পাওয়া যায়। তিল আর কাউন এমন দুইটি শস্য যা পানি জমা একদম পছন্দ করে না, তাই তারা বেলে মাটিতে স্বাভাবিকভাবে ভালো জন্মায়। ভুট্টার শিকড় যেহেতু গভীর ও শক্তিশালী হয়, তাই পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো এমন বেলে মাটিতে তা দ্রুত বাড়ে। এছাড়া যবও বেলে মিশ্র মাটিতে ভালো ফলন দেয়, বিশেষ করে শুষ্ক ও উঁচু এলাকায়।

মশলা জাতীয় ফসল

মশলা জাতীয় ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ বেলে মাটির সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মানিয়ে চলে। কারণ বেলে মাটি যত আলগা হয়, পেঁয়াজের গুটি তত সুন্দর ফুলে ওঠে। রসুন, হলুদ ও আদার ক্ষেত্রেও একই সুবিধা পাওয়া যায়। তাদের শেকড় যত বেশি সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তত বেশি শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যকর হয় তাদের বৃদ্ধি। তাই যারা বেলে মাটিতে মশলা চাষ করতে চান, তারা খুব সহজেই লাভজনক উৎপাদন পেতে পারেন।

অন্যান্য বিশেষ ফসল

সুগার বিট এমন একটি ফসল যেটি মূলত নাতিশীতোষ্ণ দেশে বেশি চাষ হলেও বেলে মাটিতে তা অত্যন্ত ভালোভাবে জন্মে। আবার আলফালফা, যা সাধারণত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, হালকা ও দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে ভালোভাবে বৃদ্ধির জন্য পরিচিত। তাই বেলে মাটির জমি বড় হলে এই দুই ফসল বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে।

বেলে মাটিতে ফসল উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল

ফসল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আমি সবসময় বলি, বেলে মাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জৈব পদার্থ যোগ করা। কম্পোস্ট বা গোবর সার মাটিতে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। মালচিংও এই মাটিতে অসাধারণ কাজ করে। খড়, পাতা বা পলিথিন শীত গ্রীষ্ম দুই মৌসুমেই মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে। সেচের ক্ষেত্রে অল্প অল্প করে নিয়মিত পানি দিলে ফসল তার প্রয়োজন অনুযায়ী জল পায়। আর সার ধাপে ধাপে প্রয়োগ করলে পুষ্টি ধোয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

সেচ এবং সার ব্যবস্থাপনা

বেলে মাটিতে পানি বেশি দিলে তা এক মুহূর্তেই নিচে নেমে যায়, ফলে গাছ আসল প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা পায় না। তাই সেচের সময় একবারে বেশি না দিয়ে নিয়মিত, স্বল্প পরিমাণে সেচ দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর। সারের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম একবারে বেশি সার দিলে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই জমি প্রস্তুতের সময় অল্প পরিমাণ সার, মাঝামাঝি সময়ে আরেকটু, আর ফল ধরার সময় আবার সামান্য সার দিলে গাছ প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে।

ফসল নির্বাচনের সময় যা ভাববেন

ফসল নির্বাচন করার সময় এলাকার আবহাওয়া, আপনার জমিতে কতটা পানি পাওয়া যায়, পূর্বে কোন ফসল ভালো জন্মেছে এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। বেলে মাটির যত বেশি জৈব উপাদান থাকবে, ফসল তত ভালো জন্মাবে। তাই যেকোনো ফসল শুরু করার আগে মাটির অবস্থা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষকের সাধারণ ভুল ও তার সমাধান

অনেক কৃষক মনে করেন বেলে মাটিতে বেশি সেচ দিলে ফলন বাড়বে, কিন্তু বাস্তবে এটা উল্টো ক্ষতি করে। আবার কেউ কেউ গভীর চাষ করেন না, ফলে মূলজাত ফসল যথাযথ আকারে গড়ে উঠতে পারে না। সবচেয়ে বড় ভুল হলো সার একবারে বেশি প্রয়োগ করা, যা দ্রুত নিচে নেমে গিয়ে অপচয় হয়। নিয়মিত জৈব সার ব্যবহার করলে এবং সেচ সার ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখলে এসব ভুল সহজেই এড়ানো যায়।

লাভজনক চাষাবাদ

বেলে মাটিতে যে ফসলগুলো দ্রুত বাড়ে এবং বাজারে যেগুলোর চাহিদা তুলনামূলক বেশি, সেগুলো আপনি বেছে নিতে পারেন। তরমুজ, চিনাবাদাম, গাজর, আলু, বাঙ্গি নিয়মিতই ভালো দাম পায় এবং সঠিক পরিচর্যায় লাভও বেশি হয়। ছোট জমিতে সঠিক পরিকল্পনা নিলেই ফলন ও লাভ দুই-ই বৃদ্ধি পেতে পারে।

আমার শেষ কথা

সবশেষে বলতে চাই বেলে মাটি মোটেও দুর্বল নয়। শুধু এর বৈশিষ্ট্য বুঝে ব্যবহার করতে হয়। যেকোনো মাটির মতোই এরও সুবিধা অসুবিধা আছে। আর সেই অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করলে আপনি স্বাভাবিকভাবেই ভালো ফল পাবেন। আমার দেখা অনেক কৃষক আছেন যারা আগে ভেবেছিলেন বেলে মাটি কাজে আসবে না। পরে সঠিক ব্যবস্থাপনা শিখে সফল হয়েছেন। আপনি চাইলে সেই সফলতার অংশ হতে পারেন এই লেখার নির্দেশনাগুলো বাস্তবে কাজে লাগালেই হবে।

সাইলেজের জন্য ভুট্টা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য এখানে প্রবেশ করুন।

Leave a Comment