অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন কি বিস্তারিত জেনে নিন

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসছে। মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে এখন জোর দেওয়া হচ্ছে কোনো কিছু হাতে-কলমে শেখার ওপর। বাংলাদেশের নতুন শিক্ষাক্রম বা কারিকুলামেও এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এই আধুনিক ও কার্যকর শিক্ষাদান পদ্ধতির নামই হলো “অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন” (Experiential Learning)

স্যার, নোমান সৈয়দ শামসুল (১২ বছর ধরে একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা দিয়ে আসছি)। আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা আলোচনা করব অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন কি, এর পর্যায়সমূহ, গুরুত্ব এবং এটি কেন আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অপরিহার্য। আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা সচেতন অভিভাবক হয়ে থাকেন, তবে এই নিবন্ধটি আপনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন কি? (What is Experiential Learning?)

সহজ কথায় বলতে গেলে, কোনো কাজ নিজে করার মাধ্যমে বা বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা অর্জন করা হয়, তাকেই অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন বলে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey) এই ধারণার ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৮৪ সালে ডেভিড কোলব (David Kolb) এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বে রূপ দান করেন।

গতানুগতিক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক লেকচার দেন এবং শিক্ষার্থীরা তা শোনে বা বই থেকে মুখস্থ করে। কিন্তু অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনে শিক্ষার্থীরা কোনো একটি বিষয় নিয়ে সরাসরি কাজ করে, সেই কাজ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং তা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান নিজের জীবনে প্রয়োগ করে। অর্থাৎ এটি কেবল ‘জানা’ নয়, বরং ‘করে দেখা’।

কোলবের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন চক্র (Kolb’s Experiential Learning Cycle)

কোলবের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন চক্র
কোলবের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন চক্র

ডেভিড কোলব মনে করেন, শিখন একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যা চারটি স্তরের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। কোনো একটি বিষয়কে সঠিকভাবে শিখতে হলে এই চারটি ধাপ অতিক্রম করা জরুরি। নিচে এই স্তরগুলো আলোচনা করা হলো:

  1. বাস্তব অভিজ্ঞতা (Concrete Experience): শিখনের প্রথম ধাপ হলো সরাসরি কোনো কাজে অংশগ্রহণ করা। এখানে শিক্ষার্থী নতুন কিছু দেখে, শোনে বা স্পর্শ করে একটি প্রাথমিক ধারণা লাভ করে।

  2. প্রতিফলনমূলক পর্যবেক্ষণ (Reflective Observation): অভিজ্ঞতা অর্জনের পর শিক্ষার্থী তা নিয়ে চিন্তা করে। কাজটি করতে গিয়ে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে বা কী নতুন দেখল, তা বিশ্লেষণ করে।

  3. বিমূর্ত ধারণায়ন (Abstract Conceptualization): এই পর্যায়ে শিক্ষার্থী তার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে একটি তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত নেয়। সে বোঝার চেষ্টা করে যে কাজটি কেন এমন হলো এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক কারণ কী।

  4. সক্রিয় পরীক্ষণ (Active Experimentation): শেষ ধাপে শিক্ষার্থী তার অর্জিত জ্ঞানকে অন্য কোনো নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে দেখে। যদি সে সফল হয়, তবে তার শিখন পূর্ণতা পায়।

প্রচলিত শিক্ষা বনাম অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের পার্থক্য

শিক্ষাদান পদ্ধতির দিক থেকে এই দুই পদ্ধতির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। নিচের টেবিলটি লক্ষ্য করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে:

বিষয় প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি
মূল কেন্দ্র শিক্ষক (Teacher-centered) শিক্ষার্থী (Student-centered)
শেখার মাধ্যম বই পড়া ও মুখস্থ করা হাতে-কলমে কাজ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা
শিক্ষার্থীর ভূমিকা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা সক্রিয় অংশগ্রহণকারী
মূল্যায়ন পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে কাজের দক্ষতা ও প্রয়োগের ভিত্তিতে
স্থায়িত্ব দ্রুত ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে দীর্ঘকাল মনে থাকে

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি কেন অনন্য, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

  • সক্রিয়তা: এখানে শিক্ষার্থী চুপচাপ বসে থাকে না। তাকে গবেষণাগারে, মাঠে বা প্রজেক্টের কাজে সরাসরি যুক্ত হতে হয়।

  • সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা: কোনো কাজ কেন হলো বা কেন হলো না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের সৃজনশীল অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে।

  • ভুল থেকে শেখা: এই পদ্ধতিতে ভুল করাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজটিকে আরও নিখুঁত করার সুযোগ থাকে।

  • বাস্তবমুখীতা: বইয়ের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, তা সরাসরি দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।

কেন অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কেবল সার্টিফিকেট থাকলেই চলে না, প্রয়োজন দক্ষতা। অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন শিক্ষার্থীদের সেই দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে। এর গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো:

১. দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞান অর্জন

আমরা যা পড়ি তার ১০%, যা শুনি তার ২০%, কিন্তু যা আমরা নিজে করি তার ৯০% আমাদের মনে থাকে। অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনে শিক্ষার্থী নিজে কাজটি করে বলে অর্জিত জ্ঞান মস্তিষ্কে গেঁথে যায়।

২. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি

যখন একজন শিক্ষার্থী কোনো একটি কাজ নিজে সফলভাবে সম্পন্ন করে, তখন তার মধ্যে প্রবল আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এই আত্মবিশ্বাস তাকে জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।

৩. সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা (Problem Solving Skills)

বাস্তব কাজ করতে গেলে নানা ধরনের সমস্যার উদ্ভব হয়। সেই সমস্যাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর উপস্থিত বুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৪. দলগত কাজের দক্ষতা (Teamwork)

বেশিরভাগ অভিজ্ঞতামূলক কাজ বা প্রজেক্ট দলগতভাবে করতে হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একে অপরকে সাহায্য করা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং সবার সাথে মিলেমিশে কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়।

বাস্তব জীবনে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের উদাহরণ

শিক্ষাক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, তার কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • বিজ্ঞান মেলা বা ল্যাবরেটরি: বইয়ে অম্ল বা ক্ষার নিয়ে পড়ার চেয়ে ল্যাবরেটরিতে লিটমাস পেপার দিয়ে পরীক্ষা করা অনেক বেশি কার্যকর।

  • শিক্ষা সফর: ইতিহাসের কোনো বই পড়ার চেয়ে সেই ঐতিহাসিক স্থানটি পরিদর্শন করলে শিক্ষার্থীরা সেই সময়কার সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করে।

  • ইন্টার্নশিপ: উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পেশাদার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা পায়।

  • পরিবেশ রক্ষায় কাজ: পরিবেশ দূষণ নিয়ে রচনার বদলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে গাছ লাগানো বা এলাকা পরিষ্কারের কাজ করালে তারা পরিবেশের গুরুত্ব আরও বেশি বুঝতে পারে।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভূমিকা কী হবে?

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকা চিরাচরিত ‘বক্তা’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘সহায়তাকারী’ (Facilitator) হিসেবে দেখা দেয়।

  • শিক্ষকের দায়িত্ব: শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুন্দর কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেবেন। তারা যেখানে আটকে যাবে, সেখানে সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রশ্নের মাধ্যমে তাদের সমাধানের দিকে এগিয়ে নেবেন।

  • শিক্ষার্থীর দায়িত্ব: শিক্ষার্থীকে হতে হবে অনুসন্ধিৎসু। তাকে প্রশ্ন করতে হবে, পরীক্ষা করতে হবে এবং ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়া যাবে না।

নতুন শিক্ষাক্রম ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন

বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সাল থেকে যে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করছে, তার মূল ভিত্তিই হলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন। এখানে পরীক্ষার চেয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও প্রজেক্ট ভিত্তিক কাজের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তারা কেবল জ্ঞান মুখস্থ না করে, বরং সেই জ্ঞানকে দেশের ও নিজের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারে।

আমার শেষ কথা

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন কি এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি জীবনদর্শন যা আমাদের শেখায় কীভাবে বিশ্বকে অনুভব করতে হয় এবং নিজের দক্ষতাকে শাণিত করতে হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সেই তথ্যকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করার ক্ষমতা সবার থাকে না।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি পুরোপুরি এই পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়, তবে ভবিষ্যতে আমরা এমন এক প্রজন্ম পাব যারা সমস্যা দেখে ভয় পাবে না, বরং তা সমাধানের পথ খুঁজবে। তাই আসুন, আমরা মুখস্থ বিদ্যার কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে অভিজ্ঞতা ও কর্মের মাধ্যমে শেখার এই নতুন দিগন্তকে স্বাগত জানাই।

আপনার যদি এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকে বা আপনি আপনার কোনো অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে চান, তবে নিচে কমেন্ট করতে পারেন। আমাদের সাথেই থাকুন এবং নতুন কিছু শিখুন!

কমার্স এর সাবজেক্ট কি কি বিস্তারিত জানার জন্য এখানে প্রবেশ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top