বাবার সম্পত্তি বন্টন নিয়ে আমাদের সমাজে প্রায়ই নানা জটিলতা দেখা দেয়। সঠিক নিয়মের অভাব এবং অজ্ঞতার কারণে অনেক পরিবারে দূরত্ব তৈরি হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সম্পত্তি বন্টন আইনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে এই নিয়মগুলো আমাদের সবার জেনে রাখা জরুরি।
আমি, নোমান সৈয়দ শামসুল, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ভূমি ও পারিবারিক আইন নিয়ে কাজ করছি। মাঠপর্যায়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ সহজ ভাষায় এই আইনটি আপনাদের সামনে তুলে ধরব।
মুসলিম পারিবারিক আইন ও বাবার সম্পত্তি বন্টন
বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন প্রধানত মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ এবং মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বাবা মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে নির্দিষ্ট অংশে ভাগ হয়।
সম্পত্তি বন্টনের আগে কিছু জরুরি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এগুলো হলো:
-
বাবার কোনো ঋণ বা ধার থাকলে তা পরিশোধ করা।
-
স্ত্রীর মোহরানা বাকি থাকলে তা দিয়ে দেওয়া।
-
বাবার দাফন-কাফনের খরচ মেটানো।
-
তিনি কোনো বৈধ অসিয়ত (উইল) করে গেলে তা পূরণ করা (যা মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারবে না)।
প্রধান ওয়ারিশদের সম্পত্তির অংশ
ঋণ এবং অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর বাকি সম্পত্তি ওয়ারিশদের মাঝে বন্টন করা হয়। প্রধান ওয়ারিশদের প্রাপ্ত অংশ নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারী) | সম্পত্তির নির্ধারিত অংশ | বিশেষ শর্ত |
| স্ত্রী (মৃত ব্যক্তির) | ১/৮ অংশ (আট ভাগের এক ভাগ) | সন্তান বা সন্তানের সন্তান থাকলে। |
| ১/৪ অংশ (চার ভাগের এক ভাগ) | কোনো সন্তান না থাকলে। | |
| ছেলে | অবশিষ্টভোগী (Residuary) | মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পাবেন। |
| মেয়ে | ১/২ অংশ (অর্ধেক) | একক কন্যা হলে (যদি কোনো ভাই না থাকে)। |
| ২/৩ অংশ (তিন ভাগের দুই ভাগ) | একাধিক কন্যা হলে (যদি কোনো ভাই না থাকে)। |
একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম: সন্তান হিসেবে ছেলে এবং মেয়ে উভয়েই থাকলে, তারা ২:১ অনুপাতে সম্পত্তি পাবেন। অর্থাৎ, বোন যা পাবেন, ভাই তার দ্বিগুণ পাবেন।
২০২৪ সালের আইনি স্পষ্টতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট
আমি আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেখেছি, অনেকেই মনে করেন শুধু মৌখিক বন্টন বা আপসনামা করলেই সম্পত্তি নিজের হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান ভূমি আইন অনুযায়ী, সম্পত্তি বন্টনের পর দ্রুত “বন্টননামা দলিল” বা Partition Deed রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
২০২৪ সালের সংশোধিত ভূমি আইনের মূল লক্ষ্য ছিল জালিয়াতি কমানো এবং উত্তরাধিকারীদের অধিকার রক্ষা করা। ২০২৬ সালের বর্তমান নিয়মে, রেজিস্ট্রি করা বন্টননামা দলিল ছাড়া কোনো সম্পত্তির নামজারি (Mutatution) বা খাজনা নেওয়া সম্ভব নয়। তাই বাবার মৃত্যুর পর সব ওয়ারিশ মিলে রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বন্টননামা সম্পন্ন করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম।
মৃত ছেলের সন্তানরা (নাতি-নাতনি) কি সম্পত্তি পাবে?
এটি নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। সাধারণ নিয়মে, বাবা জীবিত থাকতে কোনো ছেলে মারা গেলে, পরে বাবার মৃত্যুর পর ওই মৃত ছেলের সন্তানরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতো।
তবে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা অনুযায়ী এই নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে, বাবার মৃত্যুর পর সেই মৃত সন্তান বেঁচে থাকলে যতটুকু সম্পত্তি পেত, তার সন্তানেরা (নাতি-নাতনিরা) ঠিক ততটুকুই পাবে। আমি আমার আইনি পরামর্শে সবসময় ওয়ারিশদের এই বিষয়টি মনে করিয়ে দিই, যাতে কোনো এতিম শিশু তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
বোনদের সম্পত্তি ও ভাইদের দায়িত্ব
পারিবারিক সম্পর্কের খাতিরে অনেক সময় বোনেরা ভাইদের কাছ থেকে বাপের বাড়ির সম্পত্তি নিতে চান না বা ভাইদের নামে ছেড়ে দেন। আইনগতভাবে, কোনো বোন যদি স্বেচ্ছায় তার অংশ রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে ছেড়ে না দেন, তবে মৌখিকভাবে দাবি ছেড়ে দিলে তার অধিকার নষ্ট হয় না।
ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি জটিলতা এড়াতে বোনদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। বোনদের সম্পত্তি বুঝিয়ে দিলে পারিবারিক বন্ধন যেমন শক্ত হয়, তেমনি সম্পত্তির মালিকানাও নিষ্কণ্টক থাকে।
রেফারেন্স ও তথ্যের উৎস
এই আর্টিকেলে উল্লেখিত তথ্যাদি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য এবং যাচাইকৃত। আপনি চাইলে নিচের আইনি উৎসগুলো দেখতে পারেন:
-
মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ (The Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937)
-
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (The Muslim Family Laws Ordinance, 1961)
-
বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার ও রেজিস্ট্রেশন আইন (সর্বশেষ সংশোধনীসহ)
জমি কিনতে কি কি কাগজ লাগে বিস্তারিত জানার জন্য এখানে প্রবেশ করুন।