মানুষ স্বভাবতই সুন্দর হতে চায়, আর চেহারা সুন্দর করার ইসলামিক উপায় নিয়ে আগ্রহও তাই স্বাভাবিক। ইসলাম আমাদের শেখায় যে সৌন্দর্য শুধু ত্বকের উজ্জ্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। হৃদয়ের নূরেই তার আসল প্রকাশ। আল্লাহ তা’আলা মানুষের আকৃতি সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু সেই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখা ও বাড়ানো আমাদের আমল, আচরণ ও জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে। আমরা অনেক সময় বাহ্যিক রূপের জন্য বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করি, কিন্তু ভেতরের প্রশান্তি না থাকলে মুখে স্থায়ী উজ্জ্বলতা আসে না।
যেমন, আপনি খেয়াল করবেন যে যিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন, এবং সৎ জীবনযাপন করেন, তার মুখে এক ধরনের শান্ত আলো ফুটে ওঠে। এই আলোকে ইসলামী ভাষায় বলা হয় নূর। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় আলোচনা করব কিভাবে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করে চেহারায় নূর আনা যায় এবং জীবনকে সুন্দর করা যায়।
চেহারা সুন্দর করার ইসলামিক উপায়
চেহারা সুন্দর করার ইসলামিক উপায় শুরু হয় নিয়ত থেকে। আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে গুছিয়ে রাখেন, তাহলে সেটি ইবাদতের অংশ হয়ে যায়। প্রথমত, নিয়মিত অজু করা মুখমণ্ডলে পবিত্রতা আনে এবং হাদিসে এসেছে যে অজুর অঙ্গগুলো কিয়ামতের দিন উজ্জ্বল হবে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে মানসিক চাপ কমে এবং মুখে প্রশান্ত ভাব আসে। তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়কারীদের মুখে আলাদা এক কোমলতা দেখা যায়, যা অনেকেই লক্ষ্য করেন। ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা অন্তরের কালিমা দূর করে, আর অন্তর পরিষ্কার হলে মুখেও তার প্রভাব পড়ে।
চেহারা সুন্দর করার ইসলামিক উপায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হারাম থেকে দূরে থাকা। চোখের গুনাহ, মিথ্যা কথা বা হিংসা মানুষের চেহারায় কঠোরতা এনে দেয়। অন্যদিকে, সত্যবাদিতা ও হাসিমুখ মানুষের ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণীয় করে তোলে। যেমন একজন শিক্ষক যদি কোমল ভাষায় কথা বলেন, তার মুখের অভিব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই সুন্দর লাগে।
চেহারায় নূর আনার দোয়া ও আমল
চেহারায় নূর আনার দোয়া নিয়মিত পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের জন্য দোয়া করতেন, যেখানে চোখ, মুখ ও অন্তরে নূর প্রার্থনা করা হয়েছে। আপনি প্রতিদিন ফজরের পর বা রাতে ঘুমানোর আগে এই দোয়া পড়তে পারেন।
কুরআন তিলাওয়াত চেহারায় প্রশান্তি আনে এবং হৃদয়ে শান্তি দেয়। বিশেষ করে সূরা নূর ও সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করলে আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায় বলে অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন।
নিয়মিত দরুদ শরিফ পাঠ করলে অন্তরে ভালোবাসা জন্মায় এবং আচরণ নম্র হয়। যখন কারও অন্তর নম্র হয়, তার চেহারাতেও মাধুর্য ফুটে ওঠে। সদকা বা দান করার অভ্যাসও মুখে হাসি আনে। যেমন আপনি যদি কাউকে সাহায্য করেন, তখন নিজের ভেতরে যে আনন্দ অনুভব করেন তা আপনার মুখে প্রতিফলিত হয়। এই আনন্দই আসলে নূরের একটি অংশ।
অজুর নূর ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফজিলত
অজুর নূর সম্পর্কে হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। অজু শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়, এটি আত্মার পবিত্রতাও নিশ্চিত করে।
প্রতিদিন কয়েকবার মুখ ধোয়ার মাধ্যমে ত্বক সতেজ থাকে এবং মনও প্রশান্ত হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফজিলত মানুষের চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। যিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন, তিনি সাধারণত শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করেন।
শৃঙ্খলা মানুষের ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণীয় করে তোলে। নামাজ মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে। অহংকার চেহারায় কঠোরতা আনে, কিন্তু বিনয় মুখে কোমলতা আনে। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, বিনয়ী মানুষদের মুখে স্বাভাবিক সৌন্দর্য থাকে। এ কারণেই ইসলামিক সৌন্দর্য টিপসের মধ্যে নামাজকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন ও পরিচ্ছন্নতা
সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করলে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করতেন। মিসওয়াক ব্যবহার, সুগন্ধি লাগানো এবং পরিষ্কার পোশাক পরা সুন্নাহ। পরিচ্ছন্ন পোশাক মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
আপনি যদি পরিপাটি পোশাক পরেন, নিজেকেও ভালো লাগে এবং অন্যদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
হালাল খাদ্যাভ্যাসও চেহারায় প্রভাব ফেলে।
হারাম খাবার আত্মাকে ভারী করে তোলে, কিন্তু হালাল ও পবিত্র খাবার দেহ ও মনকে সুস্থ রাখে। রোজা রাখলে শরীর ডিটক্স হয় এবং ত্বক উজ্জ্বল হয়। মধু ও কালোজিরা খাওয়ার উপকারিতা হাদিসে উল্লেখ আছে। এই সুন্নাহভিত্তিক স্বাস্থ্যচর্চা দীর্ঘমেয়াদে মুখে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা আনে।
গুনাহ থেকে বাঁচার উপায় ও অন্তরের পবিত্রতা
গুনাহ থেকে বাঁচার উপায় জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গুনাহ অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি করে এবং সেই অন্ধকার মুখেও প্রতিফলিত হয়। চোখের হেফাজত করা মানে অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা। জিহ্বার হেফাজত মানে মিথ্যা, গীবত ও কটু কথা এড়িয়ে চলা। যখন মানুষ মিথ্যা বলে, তার চেহারায় অস্থিরতা ফুটে ওঠে। অন্যদিকে, সত্যবাদী মানুষের চোখে আত্মবিশ্বাস দেখা যায়।
তাকওয়া ও ঈমান বৃদ্ধি মানুষের চেহারাকে আলোকিত করে। ইসলামে ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো চরিত্র গঠন। আপনি যদি প্রতিদিন নিজের ভুলের জন্য তওবা করেন, তাহলে অন্তর হালকা হয়। এই হালকাভাবই মুখে প্রশান্তির ছাপ ফেলে।
চেহারা সুন্দর করার ইসলামিক উপায় বাস্তব জীবনে প্রয়োগ
চেহারা সুন্দর করার ইসলামিক উপায় কেবল তত্ত্ব নয়, এটি দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের বিষয়। ধরুন একজন ছাত্র প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে দিন শুরু করে। সে নিয়মিত পড়াশোনা করে এবং মিথ্যা বলে না। তার বন্ধুদের সাথে সে ভদ্র আচরণ করে। কয়েক মাস পর আপনি দেখবেন তার ব্যক্তিত্বে আত্মবিশ্বাস এসেছে এবং মুখে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা দেখা যাচ্ছে।
এটি কোনো প্রসাধনীর ফল নয়, বরং আমলের বরকত। আমাদের সবার উচিত নিজের ভেতরটা সুন্দর করা। কারণ অন্তর সুন্দর হলে বাহ্যিক সৌন্দর্য নিজে থেকেই ফুটে ওঠে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রকৃত সৌন্দর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তাঁর আদেশ মানে, তার মুখে আল্লাহর রহমতের আলো ঝলমল করে।
এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে চেহারার আসল সৌন্দর্য আসে ঈমান, আমল ও চরিত্র থেকে। প্রসাধনী সাময়িক উজ্জ্বলতা দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী নূর আসে ইবাদত ও সৎ জীবনযাপন থেকে। তাই আসুন, আমরা নিজেদের জীবনকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সাজাই এবং সত্যিকারের সৌন্দর্য অর্জন করি।
কোন সূরা পড়লে চেহারা সুন্দর হয় বিস্তারিত জানার জন্য এখানে প্রবেশ করুন।










